মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ৩rd এপ্রিল ২০১৭

মাননীয় মন্ত্রী

MOEDU

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ - এর

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি 

নুরুল ইসলাম নাহিদ ১৯৪৫ সালে ৫ জুলাই সিলেট জেলার বিয়ানিবাজার উপজেলার কসবা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কসবা প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিয়ানীবাজার পঞ্চখন্ড হরগোবিন্দ হাই স্কুল, সিলেট এমসি কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন।

তাঁর রয়েছে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন। একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও ত্যাগী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তিনি সকল মহলে প্রশংসিত। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে তৎকালীন ছাত্রনেতাদের মধ্যে যে কয়জন আজও রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয় অবদান রাখছেন, জনাব নাহিদ তাঁদের অন্যতম। তিনি মানুষের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং তাদের জন্য সংগ্রামকেই প্রধান পেশা হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। আজও সেই কঠিন ব্রত নিয়ে আছেন জনগণের সঙ্গে, তাদেরই একজন হিসেবে।

ষাটের দশকের সূচনালগ্নে এমসি কলেজের ছাত্রাবস্থায় আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় কর্মী হিসেবে তাঁর প্রত্যক্ষ সংগ্রামী জীবনের সূচনা হয়েছিল। সিলেটে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের প্রথম মিছিল ও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এবং সক্রিয় কর্মী ও সংগঠকদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। পরবর্তীকালে জাতীয় পর্যায়ে ষাটের দশকের সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, শিক্ষার দাবি ও অধিকার অর্জন এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা, গণতন্ত্র ও জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার সকল আন্দোলন, ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধসহ ঐ সময়ের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে একজন বিশিষ্ট ছাত্রনেতা এবং সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি ছিলেন প্রথম সারিতে। ষাটের দশকের প্রথম থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তৎকালীন গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র আন্দোলনে তিনি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্র আন্দোলনের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্য জাতীয় নেতৃবৃন্দের ঘনিষ্ঠতা ও বিশেষ স্নেহ লাভের সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর।

মুক্তিযুদ্ধকালে একজন সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধা এবং তৎকালীন অন্যতম বৃহৎ ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ যৌথ গেরিলাবাহিনী সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রধান ভূমিকা ছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী-সমর্থকদের জন্য প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় তিনি দিল্লিতে ভারত সরকারের সর্বোচ্চ স্তরের নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সহযোগিতা লাভের প্রচেষ্টা গ্রহণ করে সফল হন। ন্যাপ-সিপিবি-র সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নে সম্মিলিত গেরিলাবাহিনী গড়ে তোলেন। এই তিন সংগঠনের যৌথ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ভারত সরকারের নিকট থেকে এই বাহিনীর জন্য ট্রেনিং, অস্ত্র ও অন্যান্য সাহায্য আদায় করা এবং শেষ পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখার দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন।

৬ মে, ১৯৭১ দিল্লিতে তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে গণহত্যা ও প্রতিরোধ সংগ্রামের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন। সেখানে প্রায় সকল দেশের প্রচার মিডিয়ার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর বক্তব্য দুনিয়ার সর্বত্র ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের কোন নেতার এটাই ছিল এ ধরনের প্রথম সংবাদ সম্মেলন, যেখানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়। এ সংবাদ সম্মেলন সারা দুনিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ও সার্বিক পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে ১০ মে, ১৯৭১, আন্তর্জাতিক ছাত্র ইউনিয়ন (IUS) এবং বিশ্ব যুব ফেডারেশন (WFDY) সহ বিশ্বের সকল আন্তর্জাতিক ছাত্র ও যুব সংগঠন এবং সকল দেশের ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলোর কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদানের আহবান জানিয়ে তিনি চিঠি পাঠান। তারপর সারা বিশ্বের ছাত্র-যুব সংগঠনগুলো দ্রুত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেন।

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদ ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বে সারা দেশে ‘ছাত্র বিগ্রেড’ গঠন করে সর্বক্ষেত্রে গঠনমূলক সৃজনশীল বহু কর্মকা- শুরু করেছিল। তাঁদের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্র ইউনিয়ন সর্বশ্রেষ্ঠ ছাত্র সংগঠন হয়ে উঠেছিল। সে বছর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে দেশের প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্র ইউনিয়ন জয়লাভ করেছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ৯-১১ এপ্রিল ১৯৭২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ত্রয়োদশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এত বড় আকারের বৈচিত্র্যময় ও জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এটাই ছিল সর্বপ্রথম সম্মেলন। স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার সকল সদস্য, বিদেশের রাষ্ট্রদূত, সমাজের সকল স্তরের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এবং আন্তর্জাতিক ছাত্র ইউনিয়নের মহাসচিবসহ বিশ্বের ১৯টি ছাত্র ও যুব সংগঠনের প্রতিনিধি এই সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন প্রধান অতিথি এবং নুরুল ইসলাম নাহিদ ছিলেন এই সম্মেলনের সভাপতি। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সকল ছাত্র সংগঠনকে একটি সংগঠনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঐতিহাসিক আহবান জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রয়োজনে তাঁর নিজ সংগঠন বিলুপ্ত করতেও প্রস্তুত আছেন বলে ঘোষণা দিয়ে এক অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন-স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের শত্রুরা এখনও সক্রিয়। তাদের সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করতে না পারলে জাতির জন্য মহাবিপদ নেমে আসতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন এবং লক্ষ্যও পূরণ হবে না। বিশ্বের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, স্বাধীনতা অর্জন করা খুবই কঠিন, কিন্তু প্রকৃত স্বাধীনতা রক্ষা ও তা জনগণের জন্য অর্থবহ করা অনেক বেশি কঠিন ও জটিল। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুরা তাদের পরাজয় কখনও মেনে নেবে না। সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্বের অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সমর্থন ও সহযোগিতায় তারা তাদের ষড়যন্ত্রের কৌশল পরিবর্তন করে নানা দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে নির্মম ও নিষ্ঠুর পথে জাতির সকল অর্জন ও বিজয়কে ধ্বংষ করতে মরিয়া হয়ে উঠবে। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে সকলে মিলে দৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য জাতির শত্রুদের পরাজিত করে প্রকৃত স্বাধীনতাকে জনগণের জন্য অর্থবহ করার কঠিন ও জটিল সংগ্রামের স্বার্থে ঐতিহাসিক ঐক্য অপরিহার্য। আমার এই ঐক্যের আহবানকে কেউ দুর্বলতা ভাববেন না, এটা আমাদের সংগঠনের দেশপ্রেমের তাগিত থেকে উৎসারিত।  (দৈনিক সংবাদ, ১০-০৪-১৯৭২)।

বঙ্গবন্ধুর ঐ সম্মেলনে (এবং অন্যান্য সময়েও) ছাত্র ইউনিয়ন এবং এই সংগঠনের সভাপতি নাহিদ ও সাধারণ সম্পাদক সেলিমসহ নেতা-কর্মীদের ভূমিকাকে বিশেষভাবে প্রশংসা করে তাঁর ভাষণে নাহিদের ঐক্যের বক্তব্যকে ঐতিহাসিক বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

১৯৭০ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে নুরুল ইসলাম নাহিদ তৎকালীন এই বৃহৎ ছাত্র সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এবং সাংগঠনিক সম্পাদকও ছিলেন। এর পূর্বে সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পরপর দু-বার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং সঙ্গে কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্যও নির্বাচিত হন। স্কুল জীবনেই তিনি ছাত্রসমাজের দাবিদাওয়া আদায়, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য কর্মকান্ডে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, যার ফলে তিনি পঞ্চখন্ড হরগোবিন্দ হাইস্কুলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্কুল ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন থেকেই তিনি সামরিক শাসনামলে বেআইনি ঘোষিত গোপন ছাত্র আন্দোলন ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। সিলেট এমসি কলেজ ছাত্র সংসদে তিনি পরপর দুবার নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৫৯ সালে যখন নবম শ্রেণীর ছাত্র, তখন তাঁর নিজ গ্রাম কসবা শিশু-কিশোর সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিয়ানীবাজার সমাজ কল্যাণ এসোসিয়েশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। খেলাধুলা বিশেষ করে ভলিবল, সাঁতার, হাই জাম্প, লং জাম্প প্রভৃতি প্রতিযোগিতায় তৎকালীন বৃহত্তর সিলেট জেলায় স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন।

যুবসমাজকে নতুন চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৬ সালে গঠিত যুব সংগঠন ‘বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন-এর’ প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসাবে যুবসমাজের মধ্যে নতুন ধারায় কাজ, চেতনা ও সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখেন।

নববইয়ের দশকের প্রথম দিকে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাক-বাহিনীর দালাল খুনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত ‘ঘাতক-দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র সাত সদস্যবিশিষ্ট স্টিয়ারিং কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে ঐ আন্দোলন ও গণ-আদালত সংগঠিত করাসহ নববইয়ের দশকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনা পুনরুজ্জীবিত করার ঐতিহাসিক সংগ্রামে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেন।

১৯৯৩ সালে ভারতে বাবরি মসজিদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল, তা প্রতিহত করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য শেখ হাসিনাকে আহবায়ক করে দেশের সকল অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল, ছাত্র, শ্রমিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে সর্বদলীয় ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা কমিটি’ গঠন করা হয়।

১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির (সিপিবি) অন্যতম সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠনের (সাংগঠনিক সম্পাদক) দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া পার্টির আদর্শগত শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে সিপিবি-র সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের বাস্তবতা ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পার্টিকে রূপান্তরিত করা এবং জাতীয় ঐতিহ্য  এবং দেশ ও সমাজের বাস্তবতার সাথে সঙ্গতি রেখে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার লক্ষ্যে কমিউনিষ্ট পার্টিকে রূপান্তরিত ও সংস্কারের লক্ষ্যে পরিবর্তনের চেষ্টায় তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির অধিকাংশ সদস্যসহ তিনি উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে গুনগত পরিবর্তন দেখা দিলে বাস্তবতার বিবেচনায় সেই প্রক্রিয়াতেই পরবর্তীকালে ১৯৯৩ সালে অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে তিনি যোগদান করেন। বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং মেহনতি মানুষের সংগ্রামে বিশেষ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। নববইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের নেতা হিসেবে তিনি জোটের লিয়াজোঁ কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। কিছু সময় লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৬-২০০১ ও ২০০৮-২০১৪ এবং ২০১৪ সালে সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলা (সিলেট-৬) থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ৭ম জাতীয় সংসদে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। এ ছাড়াও তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য হিসেবে জাতীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা পরিষদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট, জাতীয় শিশু পরিষদ, শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট, জাতীয় প্রেস কাউন্সিল প্রভৃতি বহু প্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে সদস্য মনোনীত হন।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালনা বোর্ড এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ট্রাস্টের পরিচালনা পরিষদের প্রথম সভাপতি। ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সভাপতি। কাউন্সিল অব মিলিটালি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজী (এমআইএসটি) এবং জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমী (নায়েম) বোর্ড অব গভর্নান্স চেয়ারম্যান। সভাপতি এনটিআরসি।

জাতীয় সংসদের সদস্য থাকাকালে তাঁর নিজ এলাকা গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারে সকল ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করতে সক্ষম হন, সাধারণ জনগণের ভাষায় ‘অতীতে পঞ্চাশ বছরেও এত উন্নয়ন হয়নি’। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে সিলেটে শিক্ষাক্ষেত্রে সার্বিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি তাঁর নিজ এলাকা ও সিলেট বিভাগের সমস্যা ও দাবিদাওয়া তুলে ধরা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য জাতীয় সংসদে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন এবং সব সময় সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণে করেছেন। সংসদের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। জাতীয় সংসদে প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত তার উজ্জ্বল ভূমিকার মধ্য দিয়ে একজন বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে সকল মহলের কাছে স্বীকৃতি লাভ করেছেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া, অর্ধ-শতাব্দী ধরে সিলেট বিভাগের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক বৈষম্য প্রভৃতি বিষয়সহ শিক্ষাক্ষেত্রে সিলেট বিভাগের জন্য সুনির্দিষ্ট করণীয় ও দাবি জাতীয় সংসদে অব্যাহতভাবে তুলে ধরেন। সিলেটে শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের দুটি উপ-পরিচালকের দপ্তর স্থাপন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ স্থাপন এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ব্রিটিশ শাসনামল থেকে চলে আসা দু-শিক্ষক পদের প্রাথমিক বিদ্যালয়’ ব্যবস্থার অবসান করে চার শিক্ষকের জাতীয় সমপর্যায়ে উন্নীত করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন প্রভৃতি সার্বিক কার্যক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে সরাসরি ভূমিকা পালন করেছেন।

তাঁর লেখা ‘বাঙালি রুখে দাঁড়াও’ (২০০৬), ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, লক্ষ্য ও সংগ্রাম’ (২০০৭), ‘রাজনীতির সুস্থধারা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম’ (২০০৯), ‘শিক্ষানীতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ (২০০৯), বাংলাদেশের অভ্যদয় ও গণতন্ত্রের পথ পরিক্রমা (২০১০) সালে প্রকাশিত হয়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য বহু বিষয়ে বিশ্লেষণমূলক কয়েক শ’ নিবন্ধ বিভিন্ন  সময়ে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি জাতীয় দৈনিক  পত্রিকা এবং সাপ্তাহিক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন।

ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য। মণিসিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাষ্টের অন্যতম ট্রাষ্টি বোর্ড সদস্য। তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্টারের আজীবন সদস্য।

১৯৭১ সালের ফ্রেব্রুয়ারি মাসে ইউরোপে তৎকালীন চেকোশেস্নাভাকিয়ার (বর্তমানে স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিশ্লাভায়) অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ছাত্র ইউনিয়নের (International Union of Students-IUS) দশম কংগ্রেসে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন এবং IUS-এর নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য, পাকিস্তানে এটাই ছিল একজন ছাত্রনেতার প্রথম কোনও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান।

বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে বিশ্বের ছাত্রসমাজের প্রতিনিধিত্বশীল সর্ববৃহৎ এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি বাঙালি জাতির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরেন এবং সকলকে সমর্থন করার আহবান জানান। তাঁরই উদ্যোগে সেই সম্মেলনে বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়, যার ফলে পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্বের ছাত্র যুবসমাজের সমর্থন লাভ সহজ হয়েছিল।

১৯৭১ সালে ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে ঢাকা ফিরে আসার আগে পাকিসত্মান সরকারকে ফাঁকি দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কোতে এক সপ্তাহ অবস্থান করে এই সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ছাত্র-যুব সংগঠনের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ছাড়াও নাহিদ সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্টি ও রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে বাংলাদেশ পরিস্থিতি এবং স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের যৌক্তিকতা ও বৈধতা এবং সমগ্র জাতির দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরে ব্যাপক তৎপরতার মাধ্যমে তাদের সমর্থন ও সাহায্যের জন্য আহবান জানান। সিবিপি-র অনুরোধে এই ব্যবস্থা হয়েছিল এবং ঐ এক সপ্তাহের কার্যক্রম ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর এক মাস পূর্বে এই তৎপরতা ছিল এক বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন, সেমিনারে যোগদানের জন্য তিনি যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি, সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া, ইউক্রেইন, বেলরুশিয়া, উজবেকিস্তান, জর্জিয়া, লাতভিয়া ও লিথুনিয়া), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান, মরিসাস, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেকোশ্লোভাকিয়া, রুমানিয়া, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, আজারবাইজান, কিউবা, সৌদি আরব, কাতার, আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, ইরান, বাহামা দ্বীপপুঞ্জ  প্রভৃতি দেশ সফর করেছেন।

১৯৯৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৫৩তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্যালেস্টাইন ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। ইউনেস্কো এর ৩৪ তম (২০০৯) এবং ৩৫ তম (২০১১) সাধারণ অধিবেশনে তার বক্তৃতা বিশেষভাবে প্রশংসা ও সমর্থন অর্জন করেছিল। ২০০৯ সালে এবং পরবর্তী মেয়াদের জন্য আবারও বাংলাদেশ ইউনেস্কো নির্বাহী বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। নুরুল ইসলাম নাহিদ ২০১৫ সালে ইউনেস্কোর ৩৮ তম জেনারেল কনফারেন্সে অন্যতম সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।

শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে (২০০৯-২০১৬) শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তনের মাধ্যমে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধনে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর উদ্যোগে প্রথমবারের মত সকল মহলের মতামত নিয়ে সমগ্র জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য ‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০’ প্রণয়ন, জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন (চলমান) সম্ভব হয়েছে। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আধুনিক বাংলাদেশের নির্মানে প্রস্ত্তত করার জন্য, শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন করে বর্তমান যুগের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বিশ্বমানের শিক্ষা, জ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জন এবং নৈতিক মূল্যবোধ, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, সততা, নিষ্ঠা এবং দেশেপ্রেমে উজ্জীবিত পরিপূর্ণ মানুষ তৈরীর লক্ষ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে এক মহা কর্মযজ্ঞ চলছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্যোগ, শৃংঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, ভর্তি নীতিমালা বাস্তবায়ন, যথাসময়ে  ক্লাশ শুরু, নির্দিষ্ট দিনে পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণ, ৬০ দিনে ফল প্রকাশ, সৃজনশীল পদ্ধতি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম প্রতিষ্ঠা, তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক প্রয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রভৃতি ব্যাপক কার্যক্রম এবং অভূতপূর্ব সফলতা সমগ্র জাতির কাছে প্রশংসিত হয়েছে এবং বিশ্ব সমাজে পেয়েছে স্বীকৃতি ও মর্যাদা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাড়াও তিনি একইসঙ্গে ২০০৯ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। ২০১৩-২০১৪ সালে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের মন্ত্রী পরিষদের সদস্য হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন। ২০১৫ সালের এই সময়টি ছিল শিক্ষার জন্য খুব চ্যালেঞ্জিং। বিএনপি ও জামাতের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ফলে সৃষ্ট অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও সময়মতো পরীক্ষা গ্রহণ, ফল প্রকাশ এবং বছরের প্রথম দিনে বাংলাদেশের সকল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল, মাদ্রাসায় ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ্যপুস্তক তুলে দেয়া সম্ভব হয়েছে। একই দিনে শিক্ষার্থীর হাতে বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেয়ার উদাহরণ দুনিয়ার কোনো দেশে নেই।

শিক্ষায় অসাধারণ ভূমিকা ও অবদানের জন্য ‘ওয়ার্ল্ড এডুকেশন কংগ্রেস’ বিশ্ব সম্মেলনে ২০১২ সালে  বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে ‘পরিবর্তনের অগ্রদূত’ আখ্যায়িত করে ‘World Education Congress Global Award for outstanding contribution to Education’ পদকে ভূষিত করা হয়।

ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর সৎ ও সহজ সরল জীবনযাপন বর্তমান সময়ে রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রম হিসেবেই সকলের কাছে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর স্ত্রী জোহরা জেসমিন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। দুই মেয়ে, নাদিয়া নন্দিতা ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নাজিয়া সামান্থা ইসলাম বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা।


Share with :
Facebook Facebook